প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
নতুন স্টেডিয়াম, পুরোনো সংকট—বরিশালের ক্রিকেটে উন্নতির অপেক্ষা
স্পোর্টস টক বিডি ডেস্ক , রিপোর্টার ||
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বড় পরিসরে ক্রিকেট ফেরার অপেক্ষায় বরিশাল। আগামী ১৫ ডিসেম্বর কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামে শুরু হওয়ার কথা ভি-খ্রি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। প্রায় পাঁচ বছর ধরে সংস্কারকাজ চলার পর ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রূপ পেয়েছে স্টেডিয়ামটি। তবে আধুনিক অবকাঠামো তৈরি হলেও স্থানীয় ক্রিকেটের উন্নয়ন নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন। অনুশীলনের উপযুক্ত মাঠের অভাব, খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাত এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতিকে বরিশালে নতুন ক্রিকেটার উঠে না আসার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন খেলোয়াড় ও সংগঠকেরা।স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা গেছে, সংস্কারের ফলে অবকাঠামোয় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। গ্যালারিতে নতুন চেয়ার, সংস্কার করা প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া ভবন, তিনতলাবিশিষ্ট হোস্টেল এবং সচল ফ্লাডলাইটে বদলে গেছে মাঠের পরিবেশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের সহকারী প্রকৌশলী মো. রায়হান গাজী জানিয়েছেন, ২০২১ সালে শুরু হওয়া সংস্কারকাজের প্রায় ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে কাজ শেষ করার সময়সীমা। ক্রীড়া সংস্থার একটি সূত্রের দাবি, নতুন চেয়ার স্থাপনের পর স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ হাজারে পৌঁছেছে।তবে সংস্কারকাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকেরা। বরিশাল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরুর অভিযোগ, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কয়েক দফায় সংস্কারকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। মাঠের ঘাস, মাটি ও বালুর কাজেও ত্রুটি ছিল বলে দাবি তাঁর। বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির প্রধান শাহনিয়ান তানিমও মনে করেন, স্টেডিয়াম সংস্কারে এত দীর্ঘ সময় লাগার কথা নয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) পরিচালক জাহিদ পারভেজ চৌধুরী সংস্কারকাজ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।স্টেডিয়ামের উন্নয়ন হলেও স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ খেলোয়াড়দের। বরিশাল জেলা দলের ক্রিকেটার মাইনুল ইসলাম সুজনের ভাষ্য, প্রায় এক দশক ধরে এ অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন ক্রিকেটার উঠে আসেননি। খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাতের কারণে যোগ্য ক্রিকেটাররা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাঁর। জেলা দলের আরেক খেলোয়াড় জহিরুল ইসলাম রকি স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দলের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের ক্রিকেটার সানিম চৌধুরী মনে করেন, বরিশালের ক্রিকেটের অন্যতম বড় বাধা অনুশীলনের উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। তাঁর কথায়, ‘বরিশালে টার্ফ উইকেটে অনুশীলন এবং নিয়মিত চর্চার জন্য আলাদা মাঠ নেই। মূল স্টেডিয়াম ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে থাকায় সেখানে ঘরোয়া লিগ আয়োজনের সুযোগও সীমিত।’ তাঁর মতে, নতুন মাঠের ব্যবস্থা না করে শুধু বড় ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় ক্রিকেটের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।খেলোয়াড় নির্বাচনের পাশাপাশি কোচ ও ম্যানেজার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বরিশাল ফরমার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোরশেদ সুমন। তাঁর অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে বিসিবির গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।বিসিবির বরিশাল জেলা ক্রিকেট কাউন্সিলর মঈনুদ্দীন রুবেল আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, প্রায় ১০ বছর খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। তাঁর মতে, স্থানীয় ক্রিকেটের মূল সংকট মাঠ, প্রশিক্ষণের জায়গা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব। ক্রীড়াঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। একটি শ্রেণি রাজধানী থেকে এসে ঝলমলে স্টেডিয়ামে প্রদর্শনী করে চলে যেতে চায়।’ ঢাকার খেলোয়াড়দের দিয়ে বরিশালের দল পরিচালনা করা হলে স্থানীয় ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।শুধু ঘরোয়া ক্রিকেট নয়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের ভেন্যু হিসেবেও বরিশালকে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সে জন্য স্টেডিয়ামের উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিয়মিত বিমান চলাচল। বড় টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আনোয়ারুল হক তারিন জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাঠের সংকট সমাধানে পরিত্যক্ত সুইমিংপুল সরিয়ে সেখানে খেলার মাঠ তৈরির বিষয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাত এড়ানো এবং বিভাগীয় দলের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।বিসিবির পরিচালক ও বরিশাল বিভাগের খেলোয়াড় নির্বাচনের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, আগামী ১৫ ডিসেম্বর সংস্কার করা স্টেডিয়াম চালু করে সেখানে ১৫ দিনব্যাপী ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ছয় দলের এই প্রতিযোগিতায় বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকার ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিন নতুন খেলোয়াড় তৈরি না হওয়া এবং পর্যাপ্ত মাঠের অভাবকে বিভাগীয় দলের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। অনুশীলনের সুযোগ বাড়াতে বিকেএসপির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সেখানে ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিজানুর।সব মিলিয়ে, বরিশালে আধুনিক স্টেডিয়াম চালু হওয়া স্থানীয় ক্রিকেটের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন নিয়মিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, পর্যাপ্ত অনুশীলন মাঠ, স্বচ্ছ খেলোয়াড় নির্বাচন এবং প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের বিকাশের সুযোগ। অন্যথায় নতুন স্টেডিয়ামের জৌলুশ থাকলেও বরিশালের ক্রিকেটে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
স্পোর্টস টক বিডি - রিপোর্টার
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত Sports Talk BD