আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। আগামী ২৬ অক্টোবর জানা যাবে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর নাম। ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বড় স্বীকৃতি এই পুরস্কার। গতবার সেরার মুকুট উঠেছিল উসমান দেম্বেলের মাথায়। এবার কে হবেন নতুন বিজয়ী, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছেন ৩০ জন ফুটবলার। তালিকায় রয়েছেন বর্তমান বিজয়ী দেম্বেলে, আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসিও। তবে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন বায়ার্ন মিউনিখের দুই তারকা হ্যারি কেইন ও মাইকেল ওলিসে। তাঁদের সঙ্গে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে বার্সেলোনার তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের নাম।
১০০ জন সাংবাদিকের ভোটে নির্বাচিত হন ব্যালন ডি’অরজয়ী। প্রত্যেক ভোটার তাঁদের পছন্দের খেলোয়াড়দের ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ক্রমানুসারে বেছে নেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, দলের অর্জনে অবদান, জেতা ট্রফি এবং মাঠ ও মাঠের বাইরের আচরণ—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের নিজস্ব মূল্যায়নই নির্ধারণ করে বিজয়ীকে। ফলে এই পুরস্কার ঘিরে বিতর্কও নতুন কিছু নয়।
এবারের আসর ঘিরে বাড়তি আগ্রহের কারণ মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো দুই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে চলে আসা। তাঁদের পরবর্তী সময়ে ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার হাতে উঠবে, সেটিও আলোচনার বড় বিষয়।
ব্যালন ডি’অরের ভোটে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও অনেক সময় প্রভাব ফেলে। যদিও পুরস্কারের বিবেচ্য সময় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত, তবু নতুন মৌসুমের শুরুতে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা তাঁদের অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ইয়ামালকে ঘিরে বেড়েছে প্রত্যাশা।
দ্য অ্যাথলেটিকের ৯ সেপ্টেম্বরের র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা ইয়ামাল এবার উঠে এসেছেন তিন নম্বরে। তবে সবার ওপরে রয়েছেন হ্যারি কেইন। দেখে নেওয়া যাক এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা সেরা ১০ ফুটবলার।
১. হ্যারি কেইন
বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে ২০২৫-২৬ মৌসুমে হ্যারি কেইন ছিলেন দুর্দান্ত। গোল করার ধারাবাহিকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার হয়ে উঠেছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে তাঁর গোল ৫৬টি, সঙ্গে রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের হয়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আরও ১১ গোল করেছেন তিনি। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে তাঁর গোল আরও ছয়টি। সব মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে কেইনের গোলসংখ্যা ৭৩।
শুধু নিয়মিত গোল করাই নয়, বড় ম্যাচেও নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন এই স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে পাঁচ ম্যাচে করেছেন ছয় গোল। জার্মান কাপের ফাইনালেও হ্যাটট্রিক করে আলোচনায় আসেন।
বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম ভরসা ছিলেন কেইন। শেষ বত্রিশের ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে পরের ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থের গোলেও অবদান রাখেন।
তবে তাঁর পথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে গোল করলেও বায়ার্নকে বিদায় নিতে হয়। বড় দুটি আসরের শেষ পর্যায়ে দলের ব্যর্থতা তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও গোটা মৌসুমে কেইনের ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দল সব শিরোপা জিততে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন গোলমেশিন। নতুন মৌসুমেও সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে নেশনস লিগে চার ম্যাচে আরও ছয় গোল যোগ করেছেন।
৩৩ বছর বয়সী কেইনের সামনে তাই ব্যালন ডি’অর জয়ের বড় সুযোগ। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, ধারাবাহিকতা ও বড় ম্যাচে অবদান—সব মিলিয়ে এবারের দৌড়ে তাঁকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
২. মাইকেল ওলিসে
বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স
বায়ার্ন মিউনিখের আরেক তারকা মাইকেল ওলিসে এবারের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে পেনাল্টি ছাড়া গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তাঁর অবদান ছিল সর্বোচ্চ। লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে ২০ গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩২ গোল।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে সাতটি অ্যাসিস্ট করে নতুন রেকর্ড গড়েন ওলিসে। এর বাইরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও ছিল তাঁর অর্জনের অংশ।
ওলিসের বড় গুণ হলো, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের খেলার ধরন বদলে নিতে পারেন। কখন নিজে আক্রমণে যাবেন, কখন সতীর্থকে বল বাড়াবেন কিংবা কখন মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরি করবেন—এসব সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দক্ষ তিনি। ড্রিবলিং, পাসিং ও সেটপিসে তাঁর দক্ষতা দলের আক্রমণকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
শুধু আক্রমণেই নয়, বল হারানোর পর রক্ষণে ফেরার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন এই ফরাসি উইঙ্গার। বায়ার্ন ও জাতীয় দলের হয়ে অধিকাংশ ম্যাচেই ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।
তবে তাঁর সামনেও রয়েছে বড় বাধা। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোতে দলের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া ব্যালন ডি’অরের ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি শিরোপার হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে নয় গোল করেছেন ওলিসে। ফ্রান্সের হয়ে চার ম্যাচে আরও চার গোল রয়েছে তাঁর। অর্থাৎ গত মৌসুমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা এখনো ধরে রেখেছেন তিনি।
কেইন যেখানে গোলের সংখ্যায় নজর কাড়ছেন, সেখানে ওলিসে সমানভাবে অবদান রাখছেন গোল করা ও করানোর ক্ষেত্রে। ফলে তাঁকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
৩. লামিনে ইয়ামাল
বার্সেলোনা ও স্পেন
বয়স মাত্র ১৯। অথচ এরই মধ্যে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে একই কাতারে উচ্চারিত হচ্ছে লামিনে ইয়ামালের নাম। ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের খেলায় আরও পরিণত হওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন বার্সেলোনার এই তরুণ উইঙ্গার।
২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৮ ম্যাচে ১৪ গোল এবং ১৬ অ্যাসিস্ট করেছিলেন ইয়ামাল। পরের মৌসুমে মাত্র ৩৮ ম্যাচেই তাঁর গোল বেড়ে দাঁড়ায় ২২টিতে। পাশাপাশি ১৫টি অ্যাসিস্টও করেন তিনি।
অর্থাৎ কম ম্যাচ খেলেও গোলের সংখ্যায় উন্নতি করেছেন ইয়ামাল। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রেও আগের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছেন।
তবে ইনজুরি তাঁর মৌসুমে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চোটের কারণে বেশ কিছু সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। বিশ্বকাপেও প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি নিজের সামর্থ্য।
সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে একটি গোল করেন ইয়ামাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একটি অ্যাসিস্ট থাকলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করা হয়েছিল।
তারপরও ইয়ামালকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি। ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে জায়গা বের করার দক্ষতা তাঁকে বিশেষ করে তুলেছে।
নতুন মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ১১ ম্যাচে নয় গোল ও ১০ অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। স্পেনের হয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে চার ম্যাচে আরও চার গোল যোগ করেছেন।
দ্য অ্যাথলেটিকের আগের র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থান থেকে এবার তিন নম্বরে উঠে আসার পেছনে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে। এবারের পুরস্কার জিততে না পারলেও ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম বড় দাবিদার যে তিনি, তা বলাই যায়।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে
রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স
বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতেছেন ফ্রান্সের এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপের মূল পর্বে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ২২, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ফ্রান্সের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতেও ব্যক্তিগতভাবে ভালো সময় কাটিয়েছেন এমবাপ্পে। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল।
তবে দলীয় সাফল্যের দিক থেকে মৌসুমটি তাঁর জন্য হতাশার। কোচ পরিবর্তন, দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাবে রিয়াল মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। বিশ্বকাপেও ফ্রান্সকে শেষ পর্যন্ত চতুর্থ স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত হলেও দলীয় অর্জনের ঘাটতি এমবাপ্পের ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে বাধা হতে পারে।
নতুন মৌসুমে জোসে মরিনিওর অধীনে রিয়ালের হয়ে ১১ ম্যাচে ১১ গোল করেছেন তিনি। তবে দলের কৌশলগত সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।
ম্যাচের মোড় একাই ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য এমবাপ্পের রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত গোলের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও যে ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই এবার তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. রদ্রি
ম্যানচেস্টার সিটি/বার্সেলোনা ও স্পেন
ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন রদ্রি। ২০২৫-২৬ মৌসুমের শুরুটা তাঁর জন্য কঠিন হলেও বছরের শুরু থেকে পারফরম্যান্সে উন্নতি দেখা যায় এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের।
হাঁটুর গুরুতর চোটে আট মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর ফিরে হ্যামস্ট্রিং ও হাঁটুর সমস্যায়ও ভুগেছেন। ম্যানচেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ১৭ ম্যাচের ১১টিতে খেলতে পারেননি তিনি।
তবে সুস্থ হয়ে ফেরার পর মাঝমাঠে নিজের গুরুত্ব আবারও বুঝিয়ে দিয়েছেন রদ্রি। পেপ গার্দিওলার দলের আক্রমণ সাজানো, বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং খেলার গতি নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ ও কারাবাও কাপের ফাইনালে সিটির জয়ে বড় অবদান রাখেন তিনি। চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালেও ভালো পারফরম্যান্স করেন।
বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে ছিলেন দলের মধ্যমাঠের প্রধান নিয়ন্ত্রক। শেষ পর্যন্ত স্পেন শিরোপা জেতে এবং রদ্রি পান টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল।
বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পাওয়া তাঁকে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে এগিয়ে দিয়েছে।
যদিও ইনজুরির কারণে পুরো মৌসুমে খুব বেশি সময় মাঠে থাকতে পারেননি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলেছেন ২ হাজার ১৮৫ মিনিট। তবে সীমিত সময়ের মধ্যেও তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে বার্সেলোনার হয়ে খেলছেন রদ্রি। নতুন ক্লাবের জার্সিতে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৫-২ গোলের জয়ে নিজের প্রথম গোলও করেছেন।
রদ্রির বিশেষত্ব হলো, গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের বাইরেও দলের খেলায় বড় প্রভাব রাখতে পারেন তিনি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
৬. আর্লিং হালান্ড
ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ে
গোল করার ক্ষেত্রে আর্লিং হালান্ডের ধারেকাছে খুব বেশি খেলোয়াড় নেই। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ২৭ গোল করেছেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। তবে এবার তাঁর খেলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে অ্যাসিস্টের সংখ্যা বাড়ার মাধ্যমে।
প্রিমিয়ার লিগে আটটি অ্যাসিস্ট করেছেন হালান্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করেছেন আরও আটটি। এফএ কাপ জয়ের পথেও সিটির হয়ে তিন গোল ও একটি অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ক্লাবের হয়ে ৫২ ম্যাচে ৪৭টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।
জাতীয় দলের জার্সিতেও ছিলেন দুর্দান্ত। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে সাত ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল। মলদোভার বিপক্ষে ১১-১ গোলের বড় জয়ে একাই পাঁচবার জালের দেখা পান।
বিশ্বকাপেও নরওয়ের আক্রমণভাগের মূল ভরসা ছিলেন হালান্ড। মার্টিন ওডেগার্ডের সঙ্গে তাঁর পারফরম্যান্স দলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করেন তিনি।
ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মৌসুমে তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৯।
নতুন মৌসুমেও গোলের ক্ষুধা কমেনি হালান্ডের। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নয় ম্যাচে করেছেন ১২ গোল। নরওয়ের হয়ে চার ম্যাচে আরও তিন গোল যোগ করেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫৯ ম্যাচে তাঁর গোল এখন ৬৫টি।
বক্সের ভেতরে সঠিক অবস্থান নেওয়া, অল্প জায়গায় শট নেওয়া এবং সুযোগকে গোলে পরিণত করার অসাধারণ দক্ষতা হালান্ডকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে।
নরওয়েকে বিশ্বকাপের শেষ আটে তোলা এবং সিটির হয়ে ধারাবাহিক গোল করা তাঁকে ব্যালন ডি’অরের সেরা দশে জায়গা করে দিয়েছে।
৭. খভিচা কাভারাতসখেলিয়া
পিএসজি ও জর্জিয়া
পিএসজির টানা দ্বিতীয়বার ফরাসি লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন খভিচা কাভারাতসখেলিয়া। দলের আক্রমণভাগে তাঁর সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত দক্ষতা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
জর্জিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর পারফরম্যান্স মূলত ক্লাব ফুটবলের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হচ্ছে। ২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ২ হাজার ৬২৩ মিনিট খেলেছেন। এই সময়ের মধ্যে করেছেন ১৮ গোল ও ১০ অ্যাসিস্ট।
চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনাল মিলিয়ে চার গোল করেছেন, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আরও দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট যোগ করেন।
আর্সেনালের বিপক্ষে ফাইনালে পিএসজি পিছিয়ে পড়ার পর পেনাল্টি আদায় করে দলকে সমতায় ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনিই।
তবে নতুন মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্সে কিছুটা ভাটা পড়েছে। পিএসজিও লিগে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। নতুন মৌসুমে ১০ ম্যাচে ৫৫৯ মিনিট খেলে মাত্র দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন কাভারাতসখেলিয়া।
এমন পারফরম্যান্স ব্যালন ডি’অরের সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তাঁর অবদান তাঁকে সেরা দশের আলোচনায় রাখার জন্য যথেষ্ট।
৮. লুইস দিয়াজ
বায়ার্ন মিউনিখ ও কলম্বিয়া
বায়ার্ন মিউনিখের আক্রমণভাগে হ্যারি কেইন ও মাইকেল ওলিসের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন লুইস দিয়াজ। ২০২৫-২৬ মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্টের পাশাপাশি দলের সামগ্রিক আক্রমণাত্মক খেলায় তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
বায়ার্নের আক্রমণভাগকে আরও গতিশীল করে তুলেছেন এই কলম্বিয়ান উইঙ্গার। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া, দ্রুত প্রেসিং করা এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর পরিশ্রম দলের জন্য বড় সম্পদ ছিল।
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানেও পিছিয়ে ছিলেন না দিয়াজ। বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল এবং ১৭ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ ৩৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে শুরুটা ভালো হলেও পুরো টুর্নামেন্টে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দল নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি।
বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে ১০ ম্যাচে তিন গোল ও তিন অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর।
নতুন মৌসুমেও ভালো ছন্দে রয়েছেন দিয়াজ। ক্লাবের হয়ে আট ম্যাচে পাঁচ গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
কেইন ও ওলিসের মতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও বায়ার্নের সাফল্যে তাঁর অবদান কম নয়। বল পায়ে আক্রমণ তৈরি করা থেকে শুরু করে বল ছাড়া অবস্থায় প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর ছিলেন তিনি।
৯. জুড বেলিংহাম
রিয়াল মাদ্রিদ ও ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন জুড বেলিংহাম। মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোলের পর নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও করেন দুটি গোল। এর মধ্যে অতিরিক্ত সময়ে করা গোলটি ছিল জয়সূচক। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও গোল করেন ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার।
বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা সাত। তবে বেলিংহামের গুরুত্ব শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ওঠা, বলের নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার ক্ষেত্রেও ছিলেন কার্যকর।
হ্যারি কেইনের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ইংল্যান্ডের আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমটি খুব একটা ভালো কাটেনি। কাঁধের চোট নিয়ে মৌসুম শুরু করার পর হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায়ও পড়েন। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৩৭ ম্যাচে করেছেন আট গোল ও পাঁচ অ্যাসিস্ট।
আগের দুই মৌসুমের তুলনায় তাঁর এই পরিসংখ্যান বেশ কম। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২৩ গোল ও ১১ অ্যাসিস্টের পর পরের মৌসুমে করেছিলেন ১২ গোল ও ১১ অ্যাসিস্ট।
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁকে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় রেখেছে। নতুন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১১ ম্যাচে তিন গোল ও তিন অ্যাসিস্ট করেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক বিরতিতে চার ম্যাচে দুটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট যোগ করেছেন।
বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করলেও ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিকতার অভাব তাঁর অবস্থান কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে।
১০. লিওনেল মেসি
ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনা
বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই হলেও লিওনেল মেসিকে এখনো বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের আলোচনার বাইরে রাখা কঠিন। এবারের ব্যালন ডি’অরের বিবেচ্য সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল যথেষ্ট নজরকাড়া।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে আট গোল করার পাশাপাশি চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় তাঁর দুটি অ্যাসিস্ট ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপে সতীর্থদের জন্য ২৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। গত তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে এক আসরে কোনো খেলোয়াড়ের তৈরি করা সুযোগের সংখ্যায় এটি সর্বোচ্চ। অর্থাৎ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা আবারও দেখিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
ক্লাব ফুটবলেও দুর্দান্ত ছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএসের মৌসুমের শেষ ১৬ ম্যাচে প্লে-অফসহ ১৭ গোল ও ১৯ অ্যাসিস্ট করেন। তাঁর পারফরম্যান্সে ভর করে শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে মায়ামি।
নতুন মৌসুমেও তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ২০২৬ সালের এমএলএসের প্রথম ১৪ ম্যাচে করেছেন ১২ গোল ও আট অ্যাসিস্ট। লিগস কাপেও দুটি ম্যাচে দুটি গোল রয়েছে তাঁর।
ব্যালন ডি’অরের বিবেচ্য সময়ে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৪৬ ম্যাচে ৪৪ গোল ও ৩৪ অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। অর্থাৎ মোট ৭৮টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
তবে তাঁর প্রতিযোগিতার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার তুলনা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। তারপরও বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ও অসাধারণ পরিসংখ্যান তাঁকে সেরা দশে জায়গা করে দিয়েছে।
মেসি এরই মধ্যে আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। নবমবারের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও আরেকটি পুরস্কার জিততে পারলে সেটি হবে তাঁর কিংবদন্তিতুল্য ক্যারিয়ারে নতুন সংযোজন।
শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে ব্যালন ডি’অর?
এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে হ্যারি কেইনকে এগিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর গোল করার অসাধারণ দক্ষতা ও ধারাবাহিকতা। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৭৩ গোলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পারফরম্যান্স তাঁকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে মাইকেল ওলিসে গোল ও অ্যাসিস্ট—দুই ক্ষেত্রেই দুর্দান্ত। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেও নিয়মিত গোল করেছেন তিনি। আর লামিনে ইয়ামাল বয়সে তরুণ হলেও নিজের প্রতিভা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দিয়ে শীর্ষ তিনে উঠে এসেছেন।
এমবাপ্পে ও হালান্ডের গোল করার সামর্থ্য, রদ্রির বিশ্বকাপজয়ী পারফরম্যান্স, কাভারাতসখেলিয়ার চ্যাম্পিয়নস লিগে অবদান এবং মেসির অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানও আলোচনায় থাকবে।
বেলিংহাম ও দিয়াজও নিজেদের জায়গা থেকে দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলীয় অর্জন ও বড় ম্যাচের পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখবে।
সব হিসাব-নিকাশে হ্যারি কেইন এগিয়ে থাকলেও ওলিসে কিংবা ইয়ামাল শেষ মুহূর্তে চমক দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আগামী ২৬ অক্টোবরই মিলবে সব প্রশ্নের উত্তর। ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এবার উঠবে কার মাথায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।
বিষয় : ফুটবল ব্যালন ডি'আর

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। আগামী ২৬ অক্টোবর জানা যাবে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর নাম। ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বড় স্বীকৃতি এই পুরস্কার। গতবার সেরার মুকুট উঠেছিল উসমান দেম্বেলের মাথায়। এবার কে হবেন নতুন বিজয়ী, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছেন ৩০ জন ফুটবলার। তালিকায় রয়েছেন বর্তমান বিজয়ী দেম্বেলে, আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসিও। তবে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন বায়ার্ন মিউনিখের দুই তারকা হ্যারি কেইন ও মাইকেল ওলিসে। তাঁদের সঙ্গে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে বার্সেলোনার তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের নাম।
১০০ জন সাংবাদিকের ভোটে নির্বাচিত হন ব্যালন ডি’অরজয়ী। প্রত্যেক ভোটার তাঁদের পছন্দের খেলোয়াড়দের ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ক্রমানুসারে বেছে নেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, দলের অর্জনে অবদান, জেতা ট্রফি এবং মাঠ ও মাঠের বাইরের আচরণ—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের নিজস্ব মূল্যায়নই নির্ধারণ করে বিজয়ীকে। ফলে এই পুরস্কার ঘিরে বিতর্কও নতুন কিছু নয়।
এবারের আসর ঘিরে বাড়তি আগ্রহের কারণ মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো দুই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে চলে আসা। তাঁদের পরবর্তী সময়ে ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার হাতে উঠবে, সেটিও আলোচনার বড় বিষয়।
ব্যালন ডি’অরের ভোটে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও অনেক সময় প্রভাব ফেলে। যদিও পুরস্কারের বিবেচ্য সময় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত, তবু নতুন মৌসুমের শুরুতে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা তাঁদের অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ইয়ামালকে ঘিরে বেড়েছে প্রত্যাশা।
দ্য অ্যাথলেটিকের ৯ সেপ্টেম্বরের র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা ইয়ামাল এবার উঠে এসেছেন তিন নম্বরে। তবে সবার ওপরে রয়েছেন হ্যারি কেইন। দেখে নেওয়া যাক এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা সেরা ১০ ফুটবলার।
১. হ্যারি কেইন
বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে ২০২৫-২৬ মৌসুমে হ্যারি কেইন ছিলেন দুর্দান্ত। গোল করার ধারাবাহিকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার হয়ে উঠেছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে তাঁর গোল ৫৬টি, সঙ্গে রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের হয়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আরও ১১ গোল করেছেন তিনি। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে তাঁর গোল আরও ছয়টি। সব মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে কেইনের গোলসংখ্যা ৭৩।
শুধু নিয়মিত গোল করাই নয়, বড় ম্যাচেও নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন এই স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে পাঁচ ম্যাচে করেছেন ছয় গোল। জার্মান কাপের ফাইনালেও হ্যাটট্রিক করে আলোচনায় আসেন।
বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম ভরসা ছিলেন কেইন। শেষ বত্রিশের ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে পরের ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থের গোলেও অবদান রাখেন।
তবে তাঁর পথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে গোল করলেও বায়ার্নকে বিদায় নিতে হয়। বড় দুটি আসরের শেষ পর্যায়ে দলের ব্যর্থতা তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও গোটা মৌসুমে কেইনের ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দল সব শিরোপা জিততে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন গোলমেশিন। নতুন মৌসুমেও সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে নেশনস লিগে চার ম্যাচে আরও ছয় গোল যোগ করেছেন।
৩৩ বছর বয়সী কেইনের সামনে তাই ব্যালন ডি’অর জয়ের বড় সুযোগ। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, ধারাবাহিকতা ও বড় ম্যাচে অবদান—সব মিলিয়ে এবারের দৌড়ে তাঁকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
২. মাইকেল ওলিসে
বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স
বায়ার্ন মিউনিখের আরেক তারকা মাইকেল ওলিসে এবারের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে পেনাল্টি ছাড়া গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তাঁর অবদান ছিল সর্বোচ্চ। লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে ২০ গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩২ গোল।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে সাতটি অ্যাসিস্ট করে নতুন রেকর্ড গড়েন ওলিসে। এর বাইরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও ছিল তাঁর অর্জনের অংশ।
ওলিসের বড় গুণ হলো, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের খেলার ধরন বদলে নিতে পারেন। কখন নিজে আক্রমণে যাবেন, কখন সতীর্থকে বল বাড়াবেন কিংবা কখন মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরি করবেন—এসব সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দক্ষ তিনি। ড্রিবলিং, পাসিং ও সেটপিসে তাঁর দক্ষতা দলের আক্রমণকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
শুধু আক্রমণেই নয়, বল হারানোর পর রক্ষণে ফেরার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন এই ফরাসি উইঙ্গার। বায়ার্ন ও জাতীয় দলের হয়ে অধিকাংশ ম্যাচেই ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।
তবে তাঁর সামনেও রয়েছে বড় বাধা। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোতে দলের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া ব্যালন ডি’অরের ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি শিরোপার হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে নয় গোল করেছেন ওলিসে। ফ্রান্সের হয়ে চার ম্যাচে আরও চার গোল রয়েছে তাঁর। অর্থাৎ গত মৌসুমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা এখনো ধরে রেখেছেন তিনি।
কেইন যেখানে গোলের সংখ্যায় নজর কাড়ছেন, সেখানে ওলিসে সমানভাবে অবদান রাখছেন গোল করা ও করানোর ক্ষেত্রে। ফলে তাঁকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
৩. লামিনে ইয়ামাল
বার্সেলোনা ও স্পেন
বয়স মাত্র ১৯। অথচ এরই মধ্যে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে একই কাতারে উচ্চারিত হচ্ছে লামিনে ইয়ামালের নাম। ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের খেলায় আরও পরিণত হওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন বার্সেলোনার এই তরুণ উইঙ্গার।
২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৮ ম্যাচে ১৪ গোল এবং ১৬ অ্যাসিস্ট করেছিলেন ইয়ামাল। পরের মৌসুমে মাত্র ৩৮ ম্যাচেই তাঁর গোল বেড়ে দাঁড়ায় ২২টিতে। পাশাপাশি ১৫টি অ্যাসিস্টও করেন তিনি।
অর্থাৎ কম ম্যাচ খেলেও গোলের সংখ্যায় উন্নতি করেছেন ইয়ামাল। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রেও আগের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছেন।
তবে ইনজুরি তাঁর মৌসুমে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চোটের কারণে বেশ কিছু সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। বিশ্বকাপেও প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি নিজের সামর্থ্য।
সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে একটি গোল করেন ইয়ামাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একটি অ্যাসিস্ট থাকলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করা হয়েছিল।
তারপরও ইয়ামালকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি। ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে জায়গা বের করার দক্ষতা তাঁকে বিশেষ করে তুলেছে।
নতুন মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ১১ ম্যাচে নয় গোল ও ১০ অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। স্পেনের হয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে চার ম্যাচে আরও চার গোল যোগ করেছেন।
দ্য অ্যাথলেটিকের আগের র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থান থেকে এবার তিন নম্বরে উঠে আসার পেছনে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রেখেছে। এবারের পুরস্কার জিততে না পারলেও ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম বড় দাবিদার যে তিনি, তা বলাই যায়।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে
রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স
বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতেছেন ফ্রান্সের এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপের মূল পর্বে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ২২, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ফ্রান্সের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতেও ব্যক্তিগতভাবে ভালো সময় কাটিয়েছেন এমবাপ্পে। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল।
তবে দলীয় সাফল্যের দিক থেকে মৌসুমটি তাঁর জন্য হতাশার। কোচ পরিবর্তন, দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাবে রিয়াল মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। বিশ্বকাপেও ফ্রান্সকে শেষ পর্যন্ত চতুর্থ স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত হলেও দলীয় অর্জনের ঘাটতি এমবাপ্পের ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে বাধা হতে পারে।
নতুন মৌসুমে জোসে মরিনিওর অধীনে রিয়ালের হয়ে ১১ ম্যাচে ১১ গোল করেছেন তিনি। তবে দলের কৌশলগত সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।
ম্যাচের মোড় একাই ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য এমবাপ্পের রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত গোলের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও যে ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই এবার তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. রদ্রি
ম্যানচেস্টার সিটি/বার্সেলোনা ও স্পেন
ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন রদ্রি। ২০২৫-২৬ মৌসুমের শুরুটা তাঁর জন্য কঠিন হলেও বছরের শুরু থেকে পারফরম্যান্সে উন্নতি দেখা যায় এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের।
হাঁটুর গুরুতর চোটে আট মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর ফিরে হ্যামস্ট্রিং ও হাঁটুর সমস্যায়ও ভুগেছেন। ম্যানচেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ১৭ ম্যাচের ১১টিতে খেলতে পারেননি তিনি।
তবে সুস্থ হয়ে ফেরার পর মাঝমাঠে নিজের গুরুত্ব আবারও বুঝিয়ে দিয়েছেন রদ্রি। পেপ গার্দিওলার দলের আক্রমণ সাজানো, বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং খেলার গতি নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ ও কারাবাও কাপের ফাইনালে সিটির জয়ে বড় অবদান রাখেন তিনি। চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালেও ভালো পারফরম্যান্স করেন।
বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে ছিলেন দলের মধ্যমাঠের প্রধান নিয়ন্ত্রক। শেষ পর্যন্ত স্পেন শিরোপা জেতে এবং রদ্রি পান টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল।
বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পাওয়া তাঁকে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে এগিয়ে দিয়েছে।
যদিও ইনজুরির কারণে পুরো মৌসুমে খুব বেশি সময় মাঠে থাকতে পারেননি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলেছেন ২ হাজার ১৮৫ মিনিট। তবে সীমিত সময়ের মধ্যেও তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে বার্সেলোনার হয়ে খেলছেন রদ্রি। নতুন ক্লাবের জার্সিতে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৫-২ গোলের জয়ে নিজের প্রথম গোলও করেছেন।
রদ্রির বিশেষত্ব হলো, গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের বাইরেও দলের খেলায় বড় প্রভাব রাখতে পারেন তিনি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
৬. আর্লিং হালান্ড
ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ে
গোল করার ক্ষেত্রে আর্লিং হালান্ডের ধারেকাছে খুব বেশি খেলোয়াড় নেই। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ২৭ গোল করেছেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। তবে এবার তাঁর খেলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে অ্যাসিস্টের সংখ্যা বাড়ার মাধ্যমে।
প্রিমিয়ার লিগে আটটি অ্যাসিস্ট করেছেন হালান্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করেছেন আরও আটটি। এফএ কাপ জয়ের পথেও সিটির হয়ে তিন গোল ও একটি অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ক্লাবের হয়ে ৫২ ম্যাচে ৪৭টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।
জাতীয় দলের জার্সিতেও ছিলেন দুর্দান্ত। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে সাত ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল। মলদোভার বিপক্ষে ১১-১ গোলের বড় জয়ে একাই পাঁচবার জালের দেখা পান।
বিশ্বকাপেও নরওয়ের আক্রমণভাগের মূল ভরসা ছিলেন হালান্ড। মার্টিন ওডেগার্ডের সঙ্গে তাঁর পারফরম্যান্স দলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করেন তিনি।
ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মৌসুমে তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৯।
নতুন মৌসুমেও গোলের ক্ষুধা কমেনি হালান্ডের। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নয় ম্যাচে করেছেন ১২ গোল। নরওয়ের হয়ে চার ম্যাচে আরও তিন গোল যোগ করেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫৯ ম্যাচে তাঁর গোল এখন ৬৫টি।
বক্সের ভেতরে সঠিক অবস্থান নেওয়া, অল্প জায়গায় শট নেওয়া এবং সুযোগকে গোলে পরিণত করার অসাধারণ দক্ষতা হালান্ডকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে।
নরওয়েকে বিশ্বকাপের শেষ আটে তোলা এবং সিটির হয়ে ধারাবাহিক গোল করা তাঁকে ব্যালন ডি’অরের সেরা দশে জায়গা করে দিয়েছে।
৭. খভিচা কাভারাতসখেলিয়া
পিএসজি ও জর্জিয়া
পিএসজির টানা দ্বিতীয়বার ফরাসি লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন খভিচা কাভারাতসখেলিয়া। দলের আক্রমণভাগে তাঁর সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত দক্ষতা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
জর্জিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর পারফরম্যান্স মূলত ক্লাব ফুটবলের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হচ্ছে। ২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ২ হাজার ৬২৩ মিনিট খেলেছেন। এই সময়ের মধ্যে করেছেন ১৮ গোল ও ১০ অ্যাসিস্ট।
চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনাল মিলিয়ে চার গোল করেছেন, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আরও দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট যোগ করেন।
আর্সেনালের বিপক্ষে ফাইনালে পিএসজি পিছিয়ে পড়ার পর পেনাল্টি আদায় করে দলকে সমতায় ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনিই।
তবে নতুন মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্সে কিছুটা ভাটা পড়েছে। পিএসজিও লিগে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। নতুন মৌসুমে ১০ ম্যাচে ৫৫৯ মিনিট খেলে মাত্র দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন কাভারাতসখেলিয়া।
এমন পারফরম্যান্স ব্যালন ডি’অরের সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তাঁর অবদান তাঁকে সেরা দশের আলোচনায় রাখার জন্য যথেষ্ট।
৮. লুইস দিয়াজ
বায়ার্ন মিউনিখ ও কলম্বিয়া
বায়ার্ন মিউনিখের আক্রমণভাগে হ্যারি কেইন ও মাইকেল ওলিসের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন লুইস দিয়াজ। ২০২৫-২৬ মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্টের পাশাপাশি দলের সামগ্রিক আক্রমণাত্মক খেলায় তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
বায়ার্নের আক্রমণভাগকে আরও গতিশীল করে তুলেছেন এই কলম্বিয়ান উইঙ্গার। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া, দ্রুত প্রেসিং করা এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর পরিশ্রম দলের জন্য বড় সম্পদ ছিল।
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানেও পিছিয়ে ছিলেন না দিয়াজ। বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল এবং ১৭ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ ৩৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে শুরুটা ভালো হলেও পুরো টুর্নামেন্টে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দল নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি।
বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে ১০ ম্যাচে তিন গোল ও তিন অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর।
নতুন মৌসুমেও ভালো ছন্দে রয়েছেন দিয়াজ। ক্লাবের হয়ে আট ম্যাচে পাঁচ গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
কেইন ও ওলিসের মতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও বায়ার্নের সাফল্যে তাঁর অবদান কম নয়। বল পায়ে আক্রমণ তৈরি করা থেকে শুরু করে বল ছাড়া অবস্থায় প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর ছিলেন তিনি।
৯. জুড বেলিংহাম
রিয়াল মাদ্রিদ ও ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন জুড বেলিংহাম। মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোলের পর নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও করেন দুটি গোল। এর মধ্যে অতিরিক্ত সময়ে করা গোলটি ছিল জয়সূচক। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও গোল করেন ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার।
বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা সাত। তবে বেলিংহামের গুরুত্ব শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ওঠা, বলের নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার ক্ষেত্রেও ছিলেন কার্যকর।
হ্যারি কেইনের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ইংল্যান্ডের আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমটি খুব একটা ভালো কাটেনি। কাঁধের চোট নিয়ে মৌসুম শুরু করার পর হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায়ও পড়েন। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৩৭ ম্যাচে করেছেন আট গোল ও পাঁচ অ্যাসিস্ট।
আগের দুই মৌসুমের তুলনায় তাঁর এই পরিসংখ্যান বেশ কম। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২৩ গোল ও ১১ অ্যাসিস্টের পর পরের মৌসুমে করেছিলেন ১২ গোল ও ১১ অ্যাসিস্ট।
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁকে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় রেখেছে। নতুন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১১ ম্যাচে তিন গোল ও তিন অ্যাসিস্ট করেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক বিরতিতে চার ম্যাচে দুটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট যোগ করেছেন।
বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করলেও ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিকতার অভাব তাঁর অবস্থান কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে।
১০. লিওনেল মেসি
ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনা
বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই হলেও লিওনেল মেসিকে এখনো বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের আলোচনার বাইরে রাখা কঠিন। এবারের ব্যালন ডি’অরের বিবেচ্য সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল যথেষ্ট নজরকাড়া।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে আট গোল করার পাশাপাশি চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় তাঁর দুটি অ্যাসিস্ট ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপে সতীর্থদের জন্য ২৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। গত তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে এক আসরে কোনো খেলোয়াড়ের তৈরি করা সুযোগের সংখ্যায় এটি সর্বোচ্চ। অর্থাৎ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা আবারও দেখিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
ক্লাব ফুটবলেও দুর্দান্ত ছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএসের মৌসুমের শেষ ১৬ ম্যাচে প্লে-অফসহ ১৭ গোল ও ১৯ অ্যাসিস্ট করেন। তাঁর পারফরম্যান্সে ভর করে শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে মায়ামি।
নতুন মৌসুমেও তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ২০২৬ সালের এমএলএসের প্রথম ১৪ ম্যাচে করেছেন ১২ গোল ও আট অ্যাসিস্ট। লিগস কাপেও দুটি ম্যাচে দুটি গোল রয়েছে তাঁর।
ব্যালন ডি’অরের বিবেচ্য সময়ে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৪৬ ম্যাচে ৪৪ গোল ও ৩৪ অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। অর্থাৎ মোট ৭৮টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন।
তবে তাঁর প্রতিযোগিতার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার তুলনা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। তারপরও বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ও অসাধারণ পরিসংখ্যান তাঁকে সেরা দশে জায়গা করে দিয়েছে।
মেসি এরই মধ্যে আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। নবমবারের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও আরেকটি পুরস্কার জিততে পারলে সেটি হবে তাঁর কিংবদন্তিতুল্য ক্যারিয়ারে নতুন সংযোজন।
শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে ব্যালন ডি’অর?
এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে হ্যারি কেইনকে এগিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর গোল করার অসাধারণ দক্ষতা ও ধারাবাহিকতা। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৭৩ গোলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পারফরম্যান্স তাঁকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে মাইকেল ওলিসে গোল ও অ্যাসিস্ট—দুই ক্ষেত্রেই দুর্দান্ত। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেও নিয়মিত গোল করেছেন তিনি। আর লামিনে ইয়ামাল বয়সে তরুণ হলেও নিজের প্রতিভা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দিয়ে শীর্ষ তিনে উঠে এসেছেন।
এমবাপ্পে ও হালান্ডের গোল করার সামর্থ্য, রদ্রির বিশ্বকাপজয়ী পারফরম্যান্স, কাভারাতসখেলিয়ার চ্যাম্পিয়নস লিগে অবদান এবং মেসির অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানও আলোচনায় থাকবে।
বেলিংহাম ও দিয়াজও নিজেদের জায়গা থেকে দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলীয় অর্জন ও বড় ম্যাচের পারফরম্যান্স বড় ভূমিকা রাখবে।
সব হিসাব-নিকাশে হ্যারি কেইন এগিয়ে থাকলেও ওলিসে কিংবা ইয়ামাল শেষ মুহূর্তে চমক দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আগামী ২৬ অক্টোবরই মিলবে সব প্রশ্নের উত্তর। ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এবার উঠবে কার মাথায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।

মতামত